বর্ষা মানুষের মনে বাদল মেঘের মাদল বাজিয়ে দেয়। বর্ষার এক সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি দিগন্তব্যাপী আকাশ আলো মেঘে আবৃত হয়ে গেছে কোথাও এতটুকু ফাঁক নেই – “গুরু গুরু মেঘ গুমরি গুমরি, গরজে গগনে গগনে”। তারপর শুরু হয় অবিরাম বৃষ্টির ধারা। বর্ষণ কখনও মুশলধারে, আবার কখনও ঝিরঝিরে
“বাদলের ধারা ঝলে ঝরোঝরো, আউশের খেত জলে ভরোভরো, ধূলিমাখা মেঘ ওপারে আঁধার
ঘনায়েছে দেখ চাহিরে।” এই অবস্থায় ভাবুক মন খুঁজে পায় নদীর কুলুকুলু ধ্বনি, কখনও বা পাতার মর্মর ধ্বনি। কখনও আবার বাতাসের ও বৃষ্টির শব্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছি। বৃষ্টির ছাঁট মাঝে মাঝে ঘরের মধ্যে চলে আসছে। তাল-নারিকেল গাছ বাতাসে নুয়ে পড়েছে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছি বাইরের দিকে মন এই মুহূর্তে চিন্তাশূন্য আছে শুধু এক অব্যক্ত অনুভূতি। হর্ষে-বিষাদে মেশানো অমায়িক অনুভূতির জমির ওপর দাঁড়িয়ে অনেক ছোটো-খাটো ঘটনার কথা মনে পড়েছে। মনের মধ্যে বর্ষার সুর বেজে ওঠে। এমনই সুন্দর রূপ বোধহয় মহাকবি কালিদাসের কাব্যেও ধরা পড়েছিল – রবীন্দ্রনাথও বর্ষাকে চিত্রিত করেছেন বিভিন্নভাবে। বর্ষাকে কবিরা অবসরের ঋতু বলেছেন। অবসরের মুহূর্তে মানুষ কত কথা প্রিয়জনকে বলে আবার কত কথা অব্যক্ত থেকে যায় তবে অনেক অব্যক্তের মধ্যেই বক্তব্যের ইঙ্গিত থেকে যায়। বৈয়ব কবিদের পদাবলি থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত কবিরা বর্ষার যে ছবি এঁকেছেন তার কিছু কিছু আমার মনে উদয় হতে লাগল। বিদ্যাপতি আর গোবিন্দ দাসের অভিসার পর্যায়ের পদ মনে পড়ে গেল মনের মধ্যে এক অব্যক্ত বেদনা যেন জমা হয়ে আছে। পথঘাট জলময়। মানুষের চলাচল বন্ধ হয়ে যায় জল ছেটানো, ঝড়ের শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যায় না। সময় কোথা দিয়ে যে কেটে যায় তা ভাবাই যায় না। 1 আস্তে আস্তে সন্ধ্যা নামে রিকশার ঠুংঠাং আওয়াজ, মোটরগাড়ির রাত্রি গভীর হয়। পৃথিবী ঘুমিয়ে পড়ে।

