আর কোকিল এমন আশ্চর্য গান করল যে সম্রাটের দু চোখ জলে ভরে উঠল, চোখ ছাপিয়ে বেয়ে পড়ল গাল দিয়ে; তখন কোকিল গাইল আরও মধুর, আরও তীব্র মধুর স্বরে, তা সোজা বুকের মধ্যে এসে লাগল। সম্রাট এত খুশি হলেন যে তিনি তাকে তাঁর একপাটি সোনার চটি গলায় পরবার জন্যে দিতে চাইলেন। কিন্তু কোকিল বলল, মহারাজ, আমাকে ক্ষমা করুন, আমি আর কিছু নিতে পারব না, যথেষ্ট পুরস্কার আমি পেয়েছি। আমি সম্রাটের চোখে অশ্রু দেখেছি— সেই তো আমার পরম ঐশ্বর্য। সম্রাটের অশ্রুর অদ্ভুত ক্ষমতা এত বড়ো পুরস্কার আর কী আছে।'তরাজা সাহেবের কোকিল পাখির পর্ব ৩খন থেকে রাজসভাতেই তার বাসা হলো, নিজের সোনার খাঁচায়। দিনের মধ্যে দু-বার সে বেরোতে পারে, আর রাতে একবার। আর তার বেরোবার সময় সঙ্গে থাকে বারোজন চাকর, তাদের প্রত্যেকের হাতে পাখির পায়ের সঙ্গে বাঁধা রেশমি সুতো শক্ত করে ধরা। এ রকম বেড়ানোয় কোনো সুখ নেই, সত্যি বলতে।একদিন রাজার নামে এল মস্ত একটা পার্সেল, তার গায়ে বড়ো বড়ো অক্ষরে লেখা, 'কোকিল।'এই বিখ্যাত পাখি সম্বন্ধে নতুন একটা বই এল, রাজা বললেন।কিন্তু বই তো নয়, বাক্সের মধ্যে ছোটো একটা জিনিস। চমৎকার কাজ করা একটা কলের কোকিল, মণি মুক্তো হীরে জহরতে ঝলোমলো, সত্যিকারের পাখির মতো তার গান। কলের পাখিটায় দম দিয়েছ কি সে অবিকল কোকিলের মতো গাইতে শুরু করবে, আর সঙ্গে সঙ্গে দুলবে তার সোনা-রুপোর কাজ-করা লেজ। গলায় তার ছোট্ট ফিতে বাঁধা, তাতে লেখা : 'জাপানের মহামহিমান্বিত সম্রাটের কোকিলের তুলনায়'এখন এরা দুজন একসঙ্গে গান করুক', রাজা বললেন। 'সে কী চমৎকারই হবে কোকিলবাহক বলল, 'আমাদের কোকিলের কিছু দোষ নয়; ও বাঁধা সুরে গায়— একেবারে নিখুঁত। ভারপর কলের কোকিল একা গাইল। আসল কোকিলেরই মতো সে মুগ্ধ করল তার ওপর সে দেখতে অনেক ভালো, বাজুবন্ধহারের মতো ঝলমল করছে।একবার নয়, দুবার নয়, বত্রিশবার কলের কোকিল সেই একই গৎ গাইল, তবু ক্লান্ত হলো না। অমাত্যদের আবার শুনতেও আপত্তি নেই, কিন্তু সম্রাট বললেন, 'এখন জ্যাঙ্ক কোকিল কিছু গান করুক।' কিন্তু কোথায় সে গাইল নিজের খেয়ােসত্যিকারের কোকিল কখন সে উড়ে গেছে খোলা জানালা দিয়ে ফিরে গেছে বনের সবুজ বুকে, কেউ লক্ষ করেনি।তারপর অবশ্য কলের কোকিলকে আবার গাইতে হলো, চৌত্রিশবারের বার একই গৎ তারা শুনল। পরের পূর্ণিমায় রাজ্যের সব প্রজাকে নিমন্ত্রণ করা হলো এই পাখি দেখতে- সংগীতবিশারদ দেখাবেন। গানও শুনতে হবে তাদের, রাজার হুকুম। গান তারা শুনল- একবার নয়, দু-বার নয়, ছত্রিশবার। এত খুশি হলো তারা গান শুনে, যেন ছত্রিশ পেয়ালা চা খেয়েছে। কেউ বলল আহা, কেউ বলল ওহো কেউ ঘাড় নাড়ল, কেউ নাড়ল মাথা; কিন্তু সেই যে জেলে, বনের মধ্যে আসল কোকিলের গান যে শুনেছিল, সে বলল, 'মন্দ নয়, কিন্তু যতবার গাইল একরকমই লাগল যেন। আর কী যেন একটা নেই মনে হলো।' কথাটা সংগীতবিশরাদ শুনে ফেললেন। ডুয়ু কুঁচকে বললেন, 'কী নেই বলো তো বাপু? তালে লয়ে সুরে মানে
ষজেলে বেচারা ঘাবড়ে চুপ করে গেল। আসল কোকিল নির্বাসিত হলো দেশ থেকে। নকল পাখিটা রইল রাজার হালে; সম্রাটের বিছানার পাশে রেশমি বালিশে সে ঘুমোয়, চারদিকে মণিমুক্তো হীরে-জহরতের সব উপঢৌকন
সংগীতবিশারদ এই নকল পাখি সম্বন্ধে পঁচিশখানা মোটা মোটা পুথি লিখে ফেললেন- তাঁর লেখা যেমন লম্বা তেমনি শুরু-গম্ভীর, চীনে ভাষার যত শক্ত-শক্ত কথা সব আছে তাতে— তবু সবাই বলল যে তারা সবটা পড়েছে। এবং পড়ে বুঝেছে, পাছে কেউ বোকা ভাবে, কি সংগীতবিশারদ চটে গিয়ে পাগলা হাতির নিচে তাদের থেঁতলে
মারেন। কাটল এক বছর এমনি করে। কলের পাখির গানের প্রত্যেকটি ছোটো ছোটো টান সম্রাটের মুখছ, তাঁর পারিষদদের মুখস্থ, প্রত্যেক চীনের মুখস্থ।এরই মধ্যে একদিন হলো কী- কলের পাখি গেয়ে চলছে, এত ভালো সে আর কখনোই যেন গায়নি- সম্রাট শুনছেন বিছানায় শুয়ে। হঠাৎ পাখিটার ভেতরে একটা শব্দ হলো, 'গন্নর, কী যে একটা ছিঁড়ে গেল 'গণ- গর্' সবগুলো ঢাকা একবার ঘুরে এল, তারপর গান গেল থেমে।

