দিনটা ছিল শুক্রবার। সাদিয়া ফজরের নামাজ আদায় করে কিছু সময় কুরআনুল কারীম তেলাওয়াত করার পর জানালার পাশে দাঁড়ালো কেন যেন হঠাৎ লামিয়ার কথা মনে পড়ে গেল তার মাঝে মধ্যে লামিয়ার কথা স্মরণ হতো তবে আজকের স্মরণটা হল অন্যান্য দিনের মতো নয় আজ লামিয়ার স্মরণের সাদিয়ার অন্তরে রক্তক্ষরণ হচ্ছে অসহ্য যন্ত্রণা যন্ত্রণা দেয় তাই সে জানালার কপাট এ মাথা ঠেকিয়ে ভাবছিলাম ইয়ার কথা ঘরের বাইরে প্রাকৃতিক দৃশ্য গুলো তাদের চোখের সামনে ভাসছে মনমুগ্ধকর প্রভাবের শীতল হাওয়া চারপাশে ভোরের পাখি দজ খানিকটা দূরে নদীর কল্লোল আকাশচুম্বী প্রভাতের এই দখিনা বাতাস তার সঙ্গী তাকে শিহরিত করেছে অথচ এর কোনো কিছুই তাদের ভাবনায় আসছে না কারণে এগুলো উপেক্ষা করে বারবার চোখের তারা তার স্মৃতিপটে ভেসে উঠেছে তাদের বাল্যকালের সেই মজার মজার ঘটনা বলি দুজনে হাতে হাত ধরে পাঠশালায় যেত নদীর পাড়ে গিয়ে মাটি দিয়ে ঘর বানানো আর তরঙ্গমালা দিয়ে ধুয়ে নিয়ে যেত।তখন দুজনে একে-অপরের কাঁধে হাত রেখে দুজনের মাথা একত্র করে আমোদ-প্রমোদে মেতে উঠতো। এসব ভাবতে ভাবতে নিজের অজান্তেই সাদিয়ার চোখ থেকে অশ্রুকণাগুলো তার কপাল বেয়ে বেয়ে পড়তে লাগলো।আর রবিকরের ছোঁয়ায় সাদিয়ার অশ্রুবিন্দুগুলো মুক্তার মত ঝলমল করতে লাগলো। সূর্যকিরণের ছোঁয়া তার অশ্রুসিক্ত চেহারাটাকে রাঙ্গিয়ে দিল। আর সাদিয়া মনে মনে বলতে লাগল, আহ! মনে হচ্ছে যেন এই দৃশ্যগুলো কিছুদিন আগেকার, যা অদ্যাবধি আমার চোখের পর্দায় ভাসছে। কিন্তু না, এসব স্মৃতি অতিবাহিত হয়েছে প্রায় 10 বছর চলছে। মাঝে ঘরের দেয়াল থেকে 9 টি ক্যালেন্ডার পরিবর্তন করা হয়েছে।এভাবে ভাবতে ভাবতে প্রায় ঘন্টা খানিক হয়ে গেল হঠাৎ সাদিয়ার পেছন থেকে কে যেন তার চোখ দুটো চেপে ধরল। সে হতভম্ব হয়ে পড়ল। বুঝে উঠতে পারল না, মানুষটাকে হতে পারে। কিছুক্ষন নিরব থাকার পর সাদিয়ার চোখ থেকে হাতটা সরে গেল। সাদিয়া পেছনে ঘুরে দেখল, একজন তরুণী। খুব চেনা চেনা মনে হচ্ছে, তবু চিনতে পারছে না । পাশে দাঁড়িয়ে আছেন সাদিয়ার মা। সাদিয়া মেয়েটিকে চিনতে না পেরে জিজ্ঞাসুনেত্রে তার মায়ের দিকে তাকাল। মা বললেন, চিনতে পারোনি একে?এ হল তোমার ছেলেবেলার বান্ধবী লামিয়া যার জন্য তুমি সদা মন খারাপ করে বসে থাকতে। দীর্ঘ 9 বছর পর অনেকে দেখে সাদিয়ার অন্তরে আনন্দের জোয়ার বইতে লাগল । অন্যদিকে যেন এই আনন্দে ভাটাও পড়ে গেল । সাদিয়ার চোখ থেকে এখন অশ্রুধারা অভিরাম ঝরতে লাগলো। সাদিয়ার চোখে অশ্রু দেখে লামিয়াও কাঁদতে লাগল। পরস্পরে আলিঙ্গন করে অঝোর ধারায় ক্রন্দন করতে লাগলো।
এ যেন বহু বছরের চাপা কান্নার বহিঃপ্রকাশ।তাদের কান্নার এ দৃশ্য দেখে সাদিয়ার মা রোদন ভরা এই পরিবেশে তাদের একাকী রেখে ভিন্ন রুমে চলে গেলেন। একপর্যায়ে তাদের কান্না বন্ধ হল। অনন্তর তারা একে অন্যের চোখের অশ্রু মুছে দিয়ে শয্যায় আসীন হয়ে আলাপচারিতায় লিপ্ত হল। এতদিন পর আমাদের কথা মনে পড়ল?তোদের কথা তো আমার সবসময়ই মনে পড়ে। তাহলে এত বছর পর গ্রামে এলি কেন? অনেকবারই আসতে চেয়েছিলাম, কিন্তু বাবার ব্যস্ততার কারণে আসতে পারিনি। এবার যখন আমার এসএসসি পরীক্ষা শেষ হল তখন বাবাকে অনেক বুঝিয়ে অনুরোধ করে রাজি করালাম। জানিস তর স্মরণে আমি কতবার কেঁদেছি? আমারও যখন তোর কথা স্মরণ হত তখন বাড়ির ব্যালকনিতে বসে তোর স্মৃতিগুলো বাতাসের সাথে বলে নিজের অন্তর্দাহ লোগো করতাম।বলছিলাম,যে কারণে সাদিয়ার খুশির সমুদ্রের ভাটা পড়ল, তা হলো লামিয়ার পোশাক। তার পোশাক দেখে সাদিয়ার আনন্দ-সমুদ্রে ভাটা পড়ছে। আমি ওকে জিজ্ঞাসা করলাম।তুই কি এই বেশে ঢাকা থেকে এসেছিস? হ্যাঁ! ঢাকা থেকে এসেই সোজা তোর কাছে এলাম। এখনো আমি বাড়িতে যাইনি।
তুই পর্দা করিস না? না স্বাভাবিক কন্ঠে উত্তর দিলো। আচ্ছা, বাদ দে ওসব কথা। একটা সুসংবাদ আছে ।
আমি এবার পরীক্ষায় জিপিএ 5 পেয়েছি। মাশা-আল্লাহ! এ তো খুব ভালো খবর। আর তোর কি অবস্থা ? আমি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করি।এ বছর মেশকাত জামাতে পড়ছি। ইনশাআল্লাহ আগামী বছর দাওরা হাদিস পড়ব। ও- তুই তাহলে মাদ্রাসায় পড়ছিস? হ্যাঁ!
হঠাৎ দেয়ালের ওপাশ থেকে একটি আওয়াজ ভেসে এল, সাদিয়া! লামিয়ার সাথে শুধু কথাই বলবে; ওকে নাস্তা দেবে না? আওয়াজটা ছিল সাদিয়ার মায়ের। 'ইশ! কথায়- কথায় তো ভুলেই গিয়েছিলাম নাস্তার কথা। কী যে করি আমি! আচ্ছা! তুই একটু বস, আমি নাস্তা নিয়ে আসছি। আচ্ছা যা । সাদিয়া নাস্তা নিয়ে এল। দুজনে একসাথে বসে সকালের নাস্তা সেরে ফেলল। খাওয়ার মাঝে লামিয়া সাদিয়াকে বলল, নাস্তা শেষ করে তুই আমাকে গ্রামটা দেখাবি ? 10 বছরে গ্রামের অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে। সাদিয়া মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। নাস্তা শেষ করে লামিয়া বলল, তুই প্রস্তুত হয়ে নে; আমি একটু বাড়ি থেকে বাবা-মাকে বলে আসছি।
সাদিয়া বোরকা ও হিজাব দ্বারা তার আপদমস্তক আবৃত করে নিল এবং নিত্য দিনের মতো চোখের উপর চশমা পড়ে নিল। অপরদিকে লামিয়া আঁটোসাঁটো পোশাক আর গেঞ্জি জাতীয় কাপড়ের পায়জামা, যাতে তার শরীরের পূর্ণ আবয়ব বোঝা যাচ্ছিল। আর গ্রীবাদেশে ওড়না ঝুলানো ছিল, যা থাকা-না-থাকা উভয়টাই যেন সমান। ওটাও আজ একটা ফ্যাশনে পরিণত হয়েছে। সাদিয়া তার সাথে যেতে যদিও কিছুটা কুণ্ঠা বোধ করছিল, কিন্তু সাদিয়ার প্রাণ প্রিয় বান্ধবী দীর্ঘকাল পর গ্রামের বাড়িতে এসেছে এবং তার কাছে গ্রামটা ঘুরে দেখার আবদার করেছে, তাই তার আবদার রক্ষার্থে দুজনে একসাথে ঘর থেকে বের হলো।
সাদিয়া যখন অন্যান্য দিন এ পথ ধরে মাদ্রাসায় যেত, তখন রাস্তার পাশে অবস্থানরত বখাটে যুবকেরাও তার প্রতি সম্মান এর দৃষ্টিতে তাকাত। কিন্ত আজ যেন দৃশ্যটা ভিন্ন রূপ ধারণ করছে। আজ এলাকার সেই বখাটে তরুণরা তাদের দিকে চোখ আর করে তাকিয়ে ছিল, যা সাদিয়ার কাছে মোটেও ভাল লাগছিল না। আর এটা কোন মুসলিম সভ্য মেয়ের নিকটেই ভালো লাগার কথা নয়।
মূলত তারা সাদিয়ার দিকে এভাবে আড় চোখে তাকিয়ে ছিল না, তারা তাকিয়ে ছিল সাদিয়ার পাশে তার হাত ধরে হেঁটে যাওয়া লামিয়ার দিকে। কিন্তু সাদিয়ার কাছে সেটাও যেন অসহ্যকর মনে হচ্ছিল।
লামিয়া সাদিয়ার পাশে থাকার কারণে মনে হচ্ছিল, যেন এলাকা সেই বখাটে ছেলেদের কুদৃষ্টি সাদিয়ার উপরেও উঠানামা করছিল। বখাটে ছেলে তো দূরের কথা, যারা সমাজের সভ্য ছেলে হিসেবে সুনাম কুড়িয়েছে, লামিয়ার আকর্ষণীয় চেহারা ও তার আঁটোসাঁটো পোশাক তাদের দৃষ্টিকেও চুম্বকের মত আকর্ষণ করছিল। বিভিন্নজন বিভিন্ন দৃষ্টিতে তার দিকে তাকাচ্ছিল, কেউ তার প্রতি তাচ্ছিল্যের নয়নে তাকাচ্ছিল, আবার কেউ তাকাচ্ছিলো উগ্র যৌনলালসা পূরণ করার বাসনায়। সর্বোপরি এই বিষয়গুলো দেখে সাদিয়ার অন্তরে দুঃসহ পরিস্থিতি জন্ম নিল।
তাই সাদিয়া লামিয়াকে নিয়ে দীর্ঘক্ষন বাইরে না থেকে বাড়ির পথ ধরল। উভয়ে তাদের নিজ নিজ বাড়ির দিকে রওনা দিল। যাওয়ার সময় সাদিয়া লানে কে লক্ষ্য করে বললো, বিকেলে বাড়িতে আসিস। দুজনে মিলে গল্প করব।

