বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম।
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়াবারকাতুহু।
প্রিয় সাথী বৃন্দ,
আশা করি আপনারা সবাই ভাল আছেন মহান আল্লাহ তাআলার অশেষ মেহেরবানীতে। আমিও আপনাদের দোয়া এবং মহান আল্লাহতালার অশেষ মেনে নিতে ভালো আছি সুস্থ আছি।
বাংলাদেশের উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার পাশের হার তলানিতে আসার বিষয়টি সাম্প্রতিক সময়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় গড় পাশের হার বিগত ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এই ফলাফল বিপর্যয়ের পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে, যা শিক্ষা ব্যবস্থার মৌলিক সমস্যা থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ পর্যন্ত বিস্তৃত। এই বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. শেখার সংকটের গভীরতা ও দুর্বল ভিত্তি (Fundamental Learning Deficit and Weak Foundation):
শিক্ষাবিদ এবং বিশ্লেষকরা বলছেন, এইচএসসি-তে ফল বিপর্যয়ের মূল কারণ হলো প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে শেখার ঘাটতি তৈরি হওয়া। এই ঘাটতি বছরের পর বছর ধরে জমতে জমতে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে এসে বড় আকার ধারণ করেছে।
প্রাথমিক স্তরে দুর্বলতা: ভিত্তি দুর্বল হওয়ার প্রধান কারণ হলো প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে মানসম্মত শিক্ষার অভাব। শিক্ষকের অপ্রতুলতা, প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব, আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতির অনুপস্থিতি এবং ক্লাসরুমে পর্যাপ্ত মনোযোগের অভাবের ফলে বহু শিক্ষার্থী প্রয়োজনীয় মৌলিক জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে পারে না।
সংখ্যাকে সাফল্যের মানদণ্ড ভাবা: দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে পাশের হার বৃদ্ধি এবং জিপিএ-৫ এর সংখ্যাকে সাফল্যের প্রতীক হিসেবে দেখানোর একটি প্রবণতা ছিল। এতে প্রকৃত শেখার মান আড়াল হয়েছে এবং শিক্ষাব্যবস্থা একটি "অসুস্থ প্রতিযোগিতা"র মধ্যে প্রবেশ করেছে। সম্প্রতি "বাস্তব মূল্যায়ন" নীতি অনুসরণ করে খাতা মূল্যায়নের কঠোরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এই দুর্বলতা প্রকটভাবে ধরা পড়েছে।
২. নির্দিষ্ট বিষয়ে দুর্বলতা (Weakness in Specific Subjects):
প্রকাশিত ফলাফলে দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ব্যাপকভাবে খারাপ ফল করেছে, যা সামগ্রিক পাসের হারকে টেনে নামিয়েছে।
ইংরেজিতে বিপর্যয়: অধিকাংশ বোর্ডেই ইংরেজিতে পাসের হার আশঙ্কাজনকভাবে কম। ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং অন্যান্য শিক্ষাবিদরা এই বিষয়টিতেই বেশি ফেল করার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইংরেজিতে মৌলিক দুর্বলতা, বহুনির্বাচনী প্রশ্ন (MCQ) না থাকা, এবং ভাষা শেখার ক্ষেত্রে দুর্বল পদ্ধতির কারণে শিক্ষার্থীরা ইংরেজি পরীক্ষায় ভালো ফল করতে পারেনি। যশোর বোর্ডের মতো কিছু বোর্ডে ইংরেজিতে ফেলের হার ৪৫ শতাংশের বেশি ছিল।
হিসাব বিজ্ঞান ও আইসিটি (ICT)-তে খারাপ ফল: ইংরেজি ছাড়াও হিসাব বিজ্ঞান ও আইসিটি (তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি) বিষয়েও শিক্ষার্থীরা উল্লেখযোগ্য হারে ফেল করেছে। হিসাব বিজ্ঞানে প্রায় ৪১ শতাংশ এবং আইসিটিতে প্রায় ২৭ শতাংশ শিক্ষার্থী ফেল করেছে। এই বিষয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা উচ্চশিক্ষায় তাদের ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগের কারণ।
৩. কোভিড-১৯ মহামারীর প্রভাব (Impact of the COVID-19 Pandemic):
এই বছর যারা পরীক্ষা দিয়েছে, তাদের শিক্ষা জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ (যেমন নবম ও দশম শ্রেণির বেশিরভাগ সময়) কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
অনলাইন ক্লাসের সীমাবদ্ধতা: মহামারীর সময় সীমিত অনলাইন ক্লাসের উপর নির্ভর করতে হয়েছিল, যেখানে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থীর ইন্টারনেট এবং ডিভাইস ব্যবহারের সুযোগ ছিল না। এর ফলে তাদের প্রস্তুতিতে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়।
অটোপাস ও সংক্ষিপ্ত সিলেবাসের ফল: ২০২০ সালে 'অটোপাস' এবং ২০২১ ও ২০২২ সালে সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি ও মূল্যায়নের প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়েছে। যখন পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস ও পূর্ণ নম্বরে পরীক্ষা ফিরে এসেছে, তখন তাদের দুর্বল ভিত্তি ও প্রস্তুতির ঘাটতি স্পষ্ট হয়েছে।
৪. সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আন্দোলনের প্রভাব (Impact of Recent Political Unrest and Movements):
ফল বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ছাত্র আন্দোলনের প্রভাবও উল্লেখ করেছেন বোর্ড কর্মকর্তারা।
প্রস্তুতিতে ঘাটতি: পরীক্ষার পূর্বে বেশ কিছুদিন শিক্ষার্থীরা রাজপথে আন্দোলনে যুক্ত থাকায় তাদের পড়াশোনার প্রস্তুতিতে মারাত্মক ঘাটতি তৈরি হয়। যশোর বোর্ডসহ অন্যান্য বোর্ডের চেয়ারম্যানরা এই বিষয়টিকেই ফলাফলের খারাপ হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
৫. খাতা মূল্যায়নে কঠোরতা ও 'বাস্তব মূল্যায়ন' নীতি (Strict Marking and 'Realistic Evaluation' Policy):
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা এবং বোর্ড কর্তৃপক্ষ এবার ফলাফলের কঠোরতা ও নিম্নগামীতার প্র���ান কারণ হিসেবে 'বাস্তব মূল্যায়ন' নীতিকে তুলে ধরেছেন।
অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার প্রবণতা হ্রাস: দীর্ঘকাল ধরে পরীক্ষকদের মধ্যে 'গ্রেস মার্কস' বা অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার একটি অলিখিত সংস্কৃতি ছিল। বোর্ডের নির্দেশনায় সেই প্রবণতা বন্ধ হয়েছে এবং খাতার যথাযথ ও কঠোর মূল্যায়ন নিশ্চিত করা হয়েছে। এই কঠোরতা পাসের হার কমিয়ে ফলাফলের একটি বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। এর মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থা একটি 'অসুস্থ প্রতিযোগিতা' থেকে বেরিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন অনেকে।
৬. অবকাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা (Infrastructural and Institutional Weakness):
ফলাফলে শহর ও গ্রামের মধ্যে বৈষম্য দেখা গেছে, যা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার দিকে ইঙ্গিত করে।
শিক্ষণ উপকরণের অভাব: বিশেষ করে গ্রামীণ ও মফস্বলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসম্মত শিক্ষক, আধুনিক ল্যাব এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষণ উপকরণের অভাব রয়েছে।
শূণ্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি: এই বছর বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (প্রায় ২০২টি) পাসের হার শূন্য, যা বিগত বছরের (৬৫টি) তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি। এটি নির্দেশ করে যে, কিছু প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান অত্যন্ত দুর্বল।
বাংলাদেশের এইচএসসির পাশের হার তলানিতে নামার ঘটনাটি একটি বিচ্ছিন্ন পরিসংখ্যান নয়, বরং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যার বহিঃপ্রকাশ। এই ফলাফল এক অর্থে একটি সতর্ক সংকেত। যদিও 'বাস্তব মূল্যায়ন' নীতি গ্রহণ করে ফলাফলের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, তবে এই ফল বিপর্যয় থেকে উত্তরণের জন্য সামগ্রিক শিক্ষা সংস্কার অপরিহার্য।
ভিত্তি শক্তিশালী করা: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার মানোন্নয়ন, বিশেষ করে ইংরেজি, গণিত এবং আইসিটি-র মতো মৌলিক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বাড়াতে হবে।
শিক্ষকের মানোন্নয়ন: শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতি প্রয়োগ এবং যোগ্য শিক্ষক নিশ্চিত করার উপর গুরুত্ব দিতে হবে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে শিক্ষা কার্যক্রমকে দূরে রাখা: পরীক্ষার সময়সূচি ও শিক্ষার্থীদের মানসিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে শিক্ষা কার্যক্রমকে মুক্ত রাখতে হবে।
শিক্ষা সংস্কৃতিতে পরিবর্তন: কেবল পাশের হার বা জিপিএ-৫ এর সংখ্যাকে সাফল্যের চূড়ান্ত মানদণ্ড না ধরে, শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিখন দক্ষতা এবং সৃজনশীলতার মূল্যায়নে মনোনিবেশ করতে হবে।
এই সংকট উত্তরণে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে, শিক্ষার মানোন্নয়নের প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে এবং দেশের উচ্চশিক্ষা ও সা
মগ্রিক মানবসম্পদ উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।


