টিকা আবিষ্কার এর শেষ অংশ!!!

alim236

বিসমিল্লাহি রহমানের রাহিম।

 

প্রিয় সাথী বৃন্দ গত পোস্টে টিকা আবিষ্কারে কাহিনীর দ্বিতীয় অংশ আলোচনা করা হয়েছে আজকে শেষ অংশ এই পোস্টে তুলে ধরব ইনশাআল্লাহ।

 

                          শেষ অংশ

 

১৮ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত গুটিবসন্তই ছিল বিশ্বের একমাত্র সংক্রামক রোগ যে রোগটিকে টিকার মাধ্যমে প্রতিহত বা দমন করা যেত। আগেই বলা হয়েছে যে, এই প্রতিরোধ মূলক ব্যাবস্থার মূলমূন্ত্র ছিল অনুরূপ কিন্তু অপেক্ষাকৃত কম তীব্র বসন্তের জীবাণুই। এই অপেক্ষাকৃত দুর্বল বসন্তের জীবাণুগুলো প্রাকৃতিকভাবে গরুর শরীরেই পাওয়া যায়। তখন পর্যন্ত এই জীবাণুগুলোকে কৃত্রিমভাবে দুর্বল বা রোগাক্রান্ত না করার উপযোগী করে প্রস্তুত করার উপায় আবিষ্কার হয়নি। সর্বপ্রথম যে বিজ্ঞানী কৃত্রিম উপায়ে একটি ব্যাকটেরিয়াকে কৃত্রিমভাবে দুর্বল করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন তিনি হলেন ফরাসী রসায়নবিদ ও অণুজীব বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর। শুধু গুটিবসন্তের টিকার ক্ষেত্রেই না এছাড়াও গুটিপোকার ক্ষতি থেকে রেশমশিল্পকে রক্ষা করে সে সময় ফ্রান্সের বস্ত্রশিল্পকে এক নতুন মাত্রা বা অধ্যায় সুচন্দা করে দিয়েছিলেন তিনি। তিনি সেই সময়ে দুধ জীবাণুমুক্তকরণের পদ্ধতি “পাস্তুরাইজেশনের”আবিষ্কারক করেছিলেন। তখন থেকেই তাঁকে চিকিৎসা অণুজীববিদ্যার অগ্রদূত বলা হয়, কেননা সেই সময় তিনিই সর্বপ্রথম দেখিয়েছিলেন যে, আণুবীক্ষনিক জীব গাঁজন ও রোগ সৃষ্টির জন্য একান্ত ভাবে দায়ী। ছত্রাক কৃত্রিম ও অবাত শ্বাসনেও বংশবিস্তার করতে পারে- তাঁর এই ধারণাটি ‘পাস্তুর প্রভাব’ নামে পরিচিত। তাছাড়া লুই পাস্তূর দুধে বাহির থেকে অণুজীব ছেড়ে দিলে দুধ টক স্বাদযুক্ত হয় এবং কেন হয় সেটার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন সুন্দর ভাবে । লুই পাস্তুর ১৮৬২ সালে তাপ ও রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে সক্রিয় ব্যাকটেরিয়ার তীব্রতা কিছুটা কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৮৭৯ সালে হাঁস-মুরগির কলেরা রোগ নিয়ে গবেষণাকালে তিনি চিকিৎসক জেনার-এর অনুরূপ ফলাফল দেখতে পেয়েছিলেন। তখন তিনি উক্ত রোগের জীবাণু প্রথমত পৃথক এবং পরে দুর্বল করে পুনরায় মুরগীর দেহে প্রবেশ করে লক্ষ্য করলেন ; মুরগীগুলো রোগমুক্ত হয়েছে। একই প্রক্রিয়া বা পদ্বতি তিনি অ্যানথ্রাক্স ও জলাতঙ্ক রোগের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন এবং সফল হন। সেই সময়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেলজয়ী চিকিৎসক রবার্ট কচ ১৮৭৫ সালে প্রথম অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু আবিষ্কার করেন। এদিকে লুইপাস্তুর অ্যানথ্রাক্সের টিকা ব্যবহার করে ১৮৮১ সালে একটি ভেড়ার পালকে অ্যানথ্রাক্সমুক্ত করেন। লুইপাস্তুর জলাতঙ্ক রোগে আক্রান্ত পশুর লালা পরীক্ষা করে সিদ্ধান্তে আসেন যে, জলাতঙ্ক সৃষ্টিকারী ভাইরাস স্নায়ুকেন্দ্র পর্যন্ত বিস্তৃত হযয়ে থাকে।

তিনি পরীক্ষা স্বরুপ রোগাক্রান্ত পশুর মস্তিষ্কের মেডুলা অবলাঙ্গাটা একটি সুস্থ পশুর দেহে প্রবেশ করিয়ে আক্রান্ত পশুর অনুরূপ উপসর্গ দেখতে পান। তাছাড়া আক্রান্ত পশুর শুষ্ক টিস্যুর ওপরে সময় ও তাপমাত্রার প্রভাব এবং সেখান থেকে দুর্বল বৈশিষ্টপূর্ণ ভাইরাস আলাদা করে সেগুলোকে টিকার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। অতঃপর পাস্তুর জলাতঙ্কের টিকা আবিষ্কার করেছিলেন ১৮৮৫ সালে। তাঁর সর্ব প্রথম রোগী ছিল নয় বছর বয়সী জোসেফ মেইস্টার নামের এক বালক, যাকে পাগলা কুকুর কামড়ে দিয়েছিল। তখন বালকটির উপর লুই পাস্তুরের জলাতঙ্কের টিকা প্রযোগ করে লক্ষ্য করেন ছেলেটি রোগমুক্ত হয়েছে এবং রোগমুক্ত হওয়ার পর দুই পাস্তুরের খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে খুব দ্রুত। অতঃপর প্রায় দুই বছর পর সংক্রামক রোগ নিয়ে বিস্তর গবেষণার লক্ষ্যে তিনি ফ্রান্সের প্যারিসে শহরে ‘পাস্তুর ইনস্টিটিউট’ গড়ে তোলেন। সেই প্রতিষ্ঠানটি এখনও বেশ সুনামের সাথে সংক্রামক রোগ সংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে গবেষণা করে যাচ্ছে অবিরাম। সর্বপ্রথম এখানেই ১৯৮৩ সালে সফলভাবে এইচ-আই-ভি ভাইরাস পৃথক করা হয়। এ পর্যন্ত উক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে দশজন বিজ্ঞানী মেডিসিন ও ফিজিওলজিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।শেষ কথা

পৃথিবীটা হচ্ছে জীবাণুদের বসবাসের আঁতুড়ঘর। এই পৃথিবীর মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীকে এইসকল জীবাণুর সাথে লড়াই করে টিকে থাকেবা থাকতে হয়। সেজন্য প্রয়োজন হয় উপযুক্ত পরিবেশ ও প্রস্তুতি। সেই সময় টিকা ছিল এই প্রস্তুতির প্রথম ধাপ। টিকা যেভাবে আমাদের আজীবন বা দীর্ঘস্থায়ী একটা সমাধান দেয় এবং টিকার আবিষ্কার মানুষকে অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করবার অদম্য শক্তি যুগিয়েছে এবং জীবনকে করেছে দীর্ঘস্থায়ী ও শিশুদেরকে দিয়েছে রোগমুক্ত নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন। আল্লাহ হাফেজ।

Comments