চাকরি কিংবা পড়াশোনার জন্য চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন এলাকায় অনেকে মেসে থাকেন। তাঁদের একটি বড় অংশই থাকেন চকবাজার এলাকার আশপাশে। এখানকার বেশির ভাগ মেসের সদস্যই শিক্ষার্থী। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় এসব শিক্ষার্থীর খাবারের খরচ বেড়েছে। এর সঙ্গে ঘরভাড়া, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়ায় গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা। এমন অবস্থায় মাস শেষে হিসাব মেলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন অনেকে।
এই শিক্ষার্থীদের একজন আপন কান্তি দাশ (১৯)। উচ্চমাধ্যমিক শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। চকবাজার এলাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয় কোচিংয়ে ভর্তি হয়েছেন তিনি। একটি ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ হলে পরিবারের স্বপ্ন পূরণ হবে—এই আশায় চট্টগ্রামে এসেছেন তিনি।
গতকাল বুধবার রাত আটটার দিকে কথা হয় আপনের সঙ্গে। তিনি বলেন, তাঁর বাবা সাগর চন্দ্র দাশ পেশায় কৃষক। বান্দরবানের লামা উপজেলার মেরাখোলা এলাকায় তাঁর দুই ভাইবোনসহ বাবা-মা থাকেন। কৃষক বাবার একার আয়েই চলে সংসার।
গত জানুয়ারিতে বিশ্ববিদ্যালয় কোচিং করতে চট্টগ্রাম আসেন আপন। তিনি বলেন, জানুয়ারি মাসে ৪ হাজার ৮০০ টাকার মধ্যে মেসের সব খরচ হয়ে যেত। ফেব্রুয়ারি থেকে তা সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা ছাড়িয়েছে। কৃষক বাবার পক্ষে প্রতিমাসে বাড়তি টাকা দেওয়া কষ্টকর। তাই মাঝেমধ্যে খরচ বাঁচাতে মেসের পাশে এক আত্মীয়ের বাসায় খাবার খেয়ে আসেন। তাতে এক বেলায় ৫০ টাকার মতো বেঁচে যায় তাঁর।
আপনের সঙ্গে একই মেসে থাকেন আরও পাঁচজন। তাঁদের কেউ কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে চাকরি খুঁজছেন। আবার কেউ ছোটখাটো চাকরি করে নিজের খরচ মেটাচ্ছেন। এই মেসের খরচের হিসাব রাখেন মিনহাজ রেজা। চট্টগ্রাম জজকোর্টের শিক্ষানবিশ আইনজীবী তিনি।
মিনহাজ বলেন, গত বছরের ডিসেম্বর ও গত জানুয়ারিতেও প্রতি বেলায় খাবারের খরচ পড়ত ৩৬ থেকে ৩৮ টাকা। এখন তা ১০ টাকা বেড়ে হয়েছে ৪৬ থেকে ৪৮ টাকা। বাসাভাড়া, গ্যাস সিলিন্ডার, বিদ্যুৎ বিল, গৃহকর্মী ও খাবারের খরচ মিলিয়ে জনপ্রতি মাসিক খরচ পড়ছে সাড়ে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা।
সাহ্রিতে কী খাচ্ছেন জানতে চাইলে মিনহাজ বলেন, করলা ও আলুভাজি রান্না হয়েছে। ডিমের দামও বাড়তি। একটু ভালোমন্দ খেতে চাইলে মাসের শুরুর দিকে খাওয়া হয়। পরে টাকার হিসাব মেলে না।
চকবাজার এলাকার মেসে থাকা আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের খাবারের তালিকায় অধিকাংশ সময়ে থাকে ডিম কিংবা সবজি। সপ্তাহে এক–দুইবার ব্রয়লার মুরগি কিনতেন আগে। এখন তা–ও কমিয়েছেন। গত কয়েক দিন মুরগির দাম দুই শর ঘরে নেমে এলেও কিনছেন না তাঁরা। সবজি-ডিমে চলছে খাবার। ইচ্ছা হলে কিনছেন কম দামি মাছ।
তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, প্রতি বেলার খাবারে খরচ বেড়েছে অন্তত ১০ টাকা। এ ছাড়া আনুষঙ্গিক খরচও বেড়েছে। তাই মাসের হিসাবে খরচ বেড়েছে অন্তত দেড় হাজার টাকা। সেই বাড়তি খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের।
পরিবার–পরিজন থেকে দূরে থাকা এই শিক্ষার্থীর অনেকে নগরে টিউশনি করে চলেন। কেউ কেউ আবার বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে ক্লাস নিচ্ছেন। অনেকে আবার খণ্ডকালীন চাকরি করেন। মাস শেষে যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনোভাবে চলছেন তাঁরা।কথা হয় নগরের চান্দগাঁও আবাসিক এলাকায় থাকা সদ্য স্নাতক পাস শিক্ষার্থী তোফায়েলুর রহমানের সঙ্গে। তিনি বলেন, প্রতি মাসে খাওয়ার খরচ বেড়েছে এক থেকে দেড় হাজার টাকা। একই সঙ্গে অন্য খরচও। টিউশনি করে মাস চলতে কষ্ট হচ্ছে। আবার এই বয়সে বাসায় টাকা চাইতেও লজ্জা হয়।

