১০০ টাকার গোলাপ কিনে উদ্যোক্তা হওয়া তাসফিয়া এখন প্রশিক্ষক

A
গোলাপের পাপড়ির গুঁড়া দিয়ে উদ্যোক্তা জীবনের শুরু হয়েছিল তাসফিয়া আফরোজের। ছবিটি ভারতের প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময়
 
গোলাপের পাপড়ির গুঁড়া দিয়ে উদ্যোক্তা জীবনের শুরু হয়েছিল তাসফিয়া আফরোজের। ছবিটি ভারতের প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময়
 
ছবি: সংগৃহীত

১০০ টাকার গোলাপ ফুল কিনে উদ্যোক্তা জীবন শুরু করেছিলেন তাসফিয়া আফরোজ। এরপর গোলাপের পাপড়ির পাশাপাশি নিমপাতা, শজনেপাতা, কমলার খোসা, আমলকী, মসুর ডাল, মুলতানি মাটি, আলু, বিটরুটসহ বিভিন্ন জিনিসের গুঁড়া বানিয়ে বিক্রি করতে থাকেন। এ আয় দিয়ে সংসারের হাল ধরেন। তবে তিনি এখন আর কেবল উদ্যোক্তাই নন, প্রশিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবেন।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ রিজিওনাল কানেকটিভিটি প্রজেক্ট-১–এর মাধ্যমে যশোরের ঝিকরগাছার মেয়ে তাসফিয়া আফরোজ (তৃণয়) ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের ড. ওয়াইএসআর হর্টিকালচার ইউনিভার্সিটিতে প্রশিক্ষণ নিতে গিয়েছিলেন ৭ মার্চ। দেশে ফিরেছেন ১৭ মার্চ রাতে। ২৯ মার্চ থেকে তিনি যশোর আর ঝিনাইদহে অন্য উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ দেবেন। এতে দুপুরের খাবার, যাতায়াত খরচসহ প্রশিক্ষক হিসেবে ভাতাও পাবেন।

১৮ মার্চ প্রথম আলো কার্যালয়ে বসে কথা বলেন তাসফিয়া আফরোজ। জানালেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বিনা মূল্যে অন্ধ্রপ্রদেশের বিশ্ববিদ্যালয়টিতে তিনিসহ ছয়জন নারী প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ পান। প্রথমে ইউটিউব দেখে গোলাপসহ বিভিন্ন পাতা ও খোসার গুঁড়া করা শিখেছিলেন তাসফিয়া। পরে দেশের ভেতরে কিছু প্রশিক্ষণ নেন। দেশের বাইরে এটাই তাঁর প্রথম সরকারিভাবে প্রশিক্ষণ। এখন প্রশিক্ষক হিসেবে কাজের সুযোগ পাওয়ায় তাঁর উদ্যোক্তাজীবনের স্বপ্নের পরিসর বেশ খানিকটা বেড়েছে বলে জানালেন।

তাসফিয়া আফরোজ প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে যা শিখেছেন, তার কিছু নমুনা ব্যাগে করে নিয়ে এসেছেন। ব্যাগ থেকে একে একে বের করলেন বিভিন্ন ফুলের পাপড়ি দিয়ে বানানো পাখি (নিজে বানিয়েছেন), শসার সাবান, গাঁদা ফুল দিয়ে মশা মারার ওষুধ, গোলাপজল, চন্দ্রমল্লিকা আর গাঁদা ফুল দিয়ে সানস্ক্রিন, ফুল দিয়ে বানানো আগরবাতি, ফুলের তেল, ফেসপ্যাকসহ অন্যান্য জিনিস। নষ্ট বা ফেলে দিতে হবে এমন ফুলের পাপড়ি দিয়ে লকেট, কানের দুল, চাবির রিং, পেপার ওয়েটসহ অন্যান্য জিনিস বানানো যায়, তার নমুনাও সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন।

সাইকেল চালিয়ে পণ্য কুরিয়ার করতে ছুটছেন তাসফিয়া। করোনার সময় ফেসবুকে ছবিটি ভাইরাল হয়েছিল
 
সাইকেল চালিয়ে পণ্য কুরিয়ার করতে ছুটছেন তাসফিয়া। করোনার সময় ফেসবুকে ছবিটি ভাইরাল হয়েছিল
 
ছবি: সংগৃহীত

তাসফিয়া বললেন, ‘আমি শুধু ফুলের পাপড়ি গুঁড়া করে তা বিক্রি করেছি। অথচ এই ফুল দিয়েই কত কিছু যে বানানো যায়, তা আমার মাথাতেই ছিল না। শুধু তাই নয়, পূজা বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ব্যবহার করার পর ওই ফুল দিয়েও যে কত কিছু বানানো যায়, তা–ও শিখে এসেছি। বিবাহবার্ষিকীসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য বাহারি ফুলের মালা বানানো শিখেছি। সেখানে যাঁদের কাছে শিখেছি, তাঁরা বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন, ফুল চাষের সময় যদি কোনো কীটনাশক ব্যবহার করা না হয়, তাহলে গোলাপ, বেলি, জবাসহ বিভিন্ন ফুলের পাপড়ি দিয়ে চাসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য বানানো যাবে।’

প্রশিক্ষণ নিতে যাওয়া ছয়জন নারীর মধ্যে একজনফুলচাষিও ছিলেন উল্লেখ করে তাসফিয়া বলেন, শুধু অর্গানিক ফুল চাষেও যে ব্যবসার বহুমুখী ব্যবহার বাড়ানো যায়, তা শিখে এসেছেন উদ্যোক্তারা। ফুলচাষিদের সঙ্গে অন্য উদ্যোক্তারা মিলে বড় আকারের ব্যবসা শুরু করা সম্ভব। তবে তার জন্য বিনিয়োগ লাগবে।

নিজের আর দেখে আসা কাজের পদ্ধতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে এই উদ্যোক্তা বলেন, ‘দেখলাম, সেখানে ফুলের পাপড়ি কাচের ঘরে শুকানো হচ্ছে। হাত দিয়ে নাড়াচাড়া বা কিছুই করতে হচ্ছে না। আর আমি মাচায় বা চাদরে বিছিয়ে তা শুকাই। বাতাসে উড়ে যায় বলে খেয়াল রাখতে হয়। রোদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জায়গা পাল্টাতে হয়। আমি গুঁড়া করি ছোট ব্লেন্ডারে, সময় বেশি লাগে। আর সেখানে দেখলাম সব কাজ হচ্ছে দ্রুত, দামি দামি মেশিনে।’

ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের ড. ওয়াইএসআর হর্টিকালচার ইউনিভার্সিটিতে প্রশিক্ষণ নেন তাসফিয়া আফরোজ

২৪ বছর বয়সী তাসফিয়া আফরোজ বললেন, ‘স্বপ্নের পরিসর বড় হয়েছে, তবে পুঁজি তো নেই। পুঁজি থাকলে যা শিখে এসেছি তা কাজে লাগাতে পারব। এত দিন বলতে গেলে তেমন কিছু না শিখেই কাজ করতাম, এখন অনেক কিছু হাতে–কলমে শিখে এসেছি।’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ রিজিওনাল কানেকটিভিটি প্রজেক্ট-১–এর প্রকল্প পরিচালক মো. মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, যে ছয়জন নারী প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরলেন, তাঁরা অন্য উদ্যোক্তাদের তা শেখাবেন। আর বিদেশে প্রশিক্ষণ নিয়ে আসাদের মধ্যে কেউ ভালো কাজ দেখাতে পারলে তাঁরা নতুন কোনো প্রকল্প হাতে নিলে তাতে মেশিনসহ বিভিন্ন সহযোগিতা দেওয়া হবে। তবে নতুন প্রকল্পটি দলভিত্তিক হলে তা অগ্রাধিকার পাবে। এ ছাড়া প্রকল্পের উদ্যোক্তাদেরও প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে হবে।

Comments