
সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। বিষয়টিকে এখন বাইডেন প্রশাসন বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে। তাদের অগ্রাধিকার নীতির তালিকায় রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের এই ইস্যু। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগে ফিলিস্তিন সমস্যা গৌণ হয়ে যাবে। তবে এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে চড়া মূল্যও দিতে হতে পারে।
সৌদি-ইসরায়েলের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এই কথিত সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ উদ্যোগ বেশ কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, ঠিক এই সময়ে বাইডেন প্রশাসন কেন এ বিষয়কে এতটা অগ্রাধিকার দিচ্ছে?
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউট থিঙ্কট্যাংকের জ্যেষ্ঠ ফেলো খালেদ এলজিনদি বলেন, বাইডেন এমনভাবে চিন্তা করছেন, যেখানে আরব-ইসরায়েল সংঘাতে ফিলিস্তিনকে কেন্দ্রীয় শক্তি বলে গণ্য করা হচ্ছে না। তাঁর বিশ্বাস, আরব রাষ্ট্রগুলো ইসরায়েলকে মেনে নিলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। সুতরাং তিনি সংঘাত বন্ধে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসে কলাম লেখক টমাস ফ্রিডম্যান লিখেছেন, বাইডেন সৌদি-ইসরায়েল চুক্তি নিশ্চিত করতে চাইছেন। এই চুক্তি করলে সৌদি আরবকে ন্যাটোর মতো করে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তাদের বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচি চালু করতে সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হবে।
ফ্রিডম্যানের লেখায় বলা হয়েছে, এই চুক্তি কাঠামোতে সরাসরি ফিলিস্তিন থাকছে না। অবশ্য তাদের কিছু কিছু বিষয় চুক্তিতে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। যেমন ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ বন্ধ করে দেওয়া এবং পশ্চিম তীরের দখলকৃত অংশ ইসরায়েলের সঙ্গে একীভূত না করার মতো প্রতিশ্রুতি।
ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য শান্তির একটি পথ বের না করে, সব চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত না করে এ ধরনের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে লাভ খুব কমই হবে। এ কারণে আমি মনে করি, দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানেরপথ বের করার ওপর আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে—ফয়সাল বিন ফারহান, সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীফ্রিডম্যান নিয়মিত প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি লিখলেও মার্কিন সরকার থেকে বিষয়টি নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এর আগে প্রতিবেদন করেছিল, যাতে বলা হয়েছিল, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বিনিময়ে ওয়াশিংটনের কাছে একটি নিরাপত্তা চুক্তি এবং পরমাণু কর্মসূচি চালানোর সুবিধা চেয়েছিল রিয়াদ।
এই সুনির্দিষ্ট চুক্তির বিষয়ে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছিলেন, তাঁরা সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি চুক্তি করাতে চান।
সৌদি আরবের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে তোলার বিষয়ে ইসরায়েলও তাদের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে কোনো রাখঢাক রাখেনি। ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ গত মাসে মার্কিন কংগ্রেসে এক ভাষণে বলেছিলেন, ‘আমরা এ রকম একটি মুহূর্তের জন্য প্রার্থনা করছি।’
আমি মনে করি না, এই ইসরায়েলি সরকার ফিলিস্তিনিদের জন্য কোনো কিছুতে ছাড় দেবে, এমনকি সেটা কাগজে-কলমে হলেও। কারণ, তারা পুরো ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণাকে ভেঙে দিতে চায়—খালেদ এলজিনদি, জ্যেষ্ঠ ফেলো, মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউট থিঙ্কট্যাংকসৌদি আরবের দিক থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আগের অবস্থানের কোনো হেরফের হয়নি। তারা এখনো আরব শান্তি উদ্যোগকে সমর্থন করে। এই শান্তি উদ্যোগের মূল শর্ত হচ্ছে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং ফিলিস্তিনিদের দুর্দশা লাঘবে ‘নিরপেক্ষ সমাধান’ বের করার মাধ্যমে কেবল ইসরায়েল রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
সৌদি কর্মকর্তারা অবশ্য এখনো ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তির বিষয়টি একেবারে উড়িয়ে দেননি। গত বছর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বলেছিলেন, তাঁর দেশ ইসরায়েলকে ‘সম্ভাবনাময় মিত্র’ হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। তবে ইসরায়েলকে অবশ্যই ফিলিস্তিনের সঙ্গে সমস্যার সমাধান করতেকতটা আন্তরিক ইসরায়েল
ফিলিস্তিনের সঙ্গে সমস্যা সমাধানে ইসরায়েল কতটা আন্তরিক, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
গত জুনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ এই অঞ্চলের স্বার্থে জরুরি। এতে সবাই লাভবান হবে।’
সৌদি আরবকে এমন কিছু করতে গেলে সেখানকার মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি আগে ভেবে দেখতে হবে—আনা জ্যাকবস, গালফ স্টেটস অ্যাট দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপবিন ফারহান বলেন, ‘কিন্তু ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য শান্তির একটি পথ বের না করে, সব চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত না করে এ ধরনের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে লাভ খুব কমই হবে। এই কারণে আমি মনে করি, দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পথ বের করার ওপর আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। ফিলিস্তিনি জনগণের মর্যাদা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার বিষয়টি আমাদের আমলে নিতে হবে।’

