‘রিকশা চালাইলে বাতাস লাগে, রাইতে গুটাশুটা হয়ে পড়ে থাকি’

A

জামালপুর থেকে ঢাকায় এসেছেন রিকশাচালক হাশেম মিয়া। সারা দিন রিকশা চালিয়ে রাতে থাকেন রাজধানীর মধ্য পাইকপাড়া এলাকার একটি গ্যারেজে। শীতে হাশেমের রিকশা চালাতে কষ্ট হচ্ছে। রাতে ঘুমাতেও সমস্যায় পড়ছেন। হাশেম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরার কষ্ট বেশি। রিকশা চালাইলে বাতাস লাগে। রাইতে গুটাশুটা হয়ে পড়ে থাকি।’

দেশের অন্যান্য এলাকার মতো রাজধানীতেও কয়েক দিন ধরে ঘন কুয়াশা 

 

আর তীব্র শীত। এতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। শীতে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন নিম্নবিত্ত ও ছিন্নমূল মানুষেরা। রিকশা-ভ্যানের চালকদের আয় কমে গেছে। শীতের মধ্যে কাজ করতে কষ্ট হচ্ছে দিনমজুরদের। কুয়াশার কারণে দূরপাল্লার বাস চালাতে চালকদের বেগ পেতে হচ্ছে। বাসের যাত্রীও কমে গেছে।

কল্যাণপুর এলাকায় গৃহকর্মীর কাজ করেন সালমা বেগম। দিনে পাঁচটি বাসায় কাজে যান। প্রতিটি বাসায় থালা-বাসন পরিষ্কার, কাপড় ধোয়া, ঘর মোছার কাজ করেন তিনি। সালমা প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটা বাসায় কল দিয়া গরম পানি আসে। বাকি বাসাতে ঠান্ডা পানি দিয়াই কাম করা লাগে। ঠান্ডা পানি লাড়তে লাড়তে হাত জইমা যায়।’

নিম্নবিত্ত ও ছিন্নমূল মানুষ শীতের কষ্ট থেকে বাঁচতে কম দামে শীতবস্ত্র কেনার চেষ্টা করছেন। কারওয়ান বাজার এলাকায় ভ্যানে পুরোনো শীতবস্ত্র বিক্রি করছিলেন হারুন মিয়া। তিনি বলেন, ‘ঠান্ডায় বিক্রি বাড়তি। যে কাপড়ই আনি, সব বেচা হয়ে যায়। ৫০ টাকা থেকে ২০০ টাকার মধ্যেই সব জিনিস বেচি।’

কয়েক দিন ধরে ভালোভাবে সূর্যের দেখা মিলছে না। দিনে বেশির ভাগ সময়ই হেডলাইট জ্বালিয়ে সড়কে চলাচল করছে যানবাহন। দূরপাল্লার বাস যাতায়াতে সমস্যা বেশি হচ্ছে। শীতের কারণে লোকজন প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। ফলে বাসে যাত্রীর সংখ্যাও অন্য সময়ের চেয়ে কম।

ঢাকা-পাবনা পথে চলাচলকারী শাহজাদপুর ট্রাভেলসের বাস চালান মোজাম্মেল হক। আজ রোববার দুপুরে মাজার রোড এলাকায় কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি বলেন, কুয়াশায় বেশি দূর দেখা যায় না। অন্য সময় পাবনা থেকে সাড়ে পাঁচ-ছয় ঘণ্টায় আসা যায়। এখন সাত ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। শীতের কারণে যাত্রী কমে গেছে জানিয়ে মোজাম্মেল বলেন, ‘আজ ৩০ জন নিয়া ঢাকা আসলাম। অন্যদিন ৪০-৪২ জন যাত্রী থাকে।’

রাজধানীর পীরেরবাগ এলাকার একটি বাড়িতে দারোয়ানের কাজ করেন খলিল মোল্লা। শীত থেকে বাঁচতে ১০০ টাকা দিয়ে একটি পুরোনো সোয়েটার কিনেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০ বছর ধরে ঢাকায় থাকি। এমন ঠান্ডা আগে দেখি নাই। রাইতে গেট লাগায় এককোনায় কুঁকড়ায় বইসা থাকি।

কল্যাণপুর পোড়া বস্তিতে বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার লোকের বসবাস। বস্তির অধিকাংশ বাসিন্দাই নিম্ন আয়ের। কেউ সিএনজিচালিত অটোরিকশা, কেউবা রিকশা চালান। পোশাকশ্রমিক ও গৃহকর্মীর সংখ্যাও অনেক। এই বস্তির কমিউনিটি বেসড অর্গানাইজেশনের (সিবিও) সাধারণ সম্পাদক হান্নান আকন্দ প্রথম আলোকে বলেন, শীতে গরিব মানুষের কষ্টের শেষ নেই। শীত তাড়াতে সন্ধ্যার পর লোকজন আগুনের পাশে বসে থাকে।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর টাউন হল, শিয়া মসজিদ, মিরপুর ১, মিরপুর ১২ নম্বরের কালশী সড়কে প্রতিদিন সকালে দিনমজুরদের হাট বসে। শ্রমিকেরা দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজের আশায় এখানে ভিড় করেন। ইট ভাঙা, নির্মাণকাজ, জোগালি, রাজমিস্ত্রি, রাজমিস্ত্রির সহকারী, কাঠমিস্ত্রি, বস্তা টানা, মাটি কাটা, ড্রেন পরিষ্কার থেকে শুরু করে এমন কোনো কাজ নেই, যা তাঁরা করেন না। শীতের কারণে দিনমজুরদের কাজ পেতে ও করতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।অভিজ্ঞতা আর কাজের ওপর ভিত্তি করে দৈনিক ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পেয়ে থাকেন শ্রমিকেরা। কাজ না পেলে বেকার দিন কাটাতে হয়। গাবতলী ক্লিনার কলোনিতে থাকেন তরিকুল। তিনি বলেন, ‘ঠান্ডায় লোকজন বাইর হয় না, কাজ দিব কে? একটা দিন কাজ না পাইলে খাওনের কষ্ট।’

Comments